আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!!

আমরা কোন স্প্যাম পাঠাবোনা। ওয়াদা।

সোমবার, মার্চ ১৭, ২০১৪

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পরমানু রাজ্য::[পর্ব--৪]


বিজ্ঞানীরা সব পদার্থের একটা করে রোল নাম্বার ঠিক করে দিয়েছেন। ৬৬ শুনলে আমাদের রক্ত গরম হয়ে যায়, ভাবি নির্ঘাত ছয় দফা। আর বিজ্ঞানীরা গম্ভীর মুখে বলেন- ডিসপ্রোসিয়াম। ৮০ শুনলে চশমা পড়া গোলগাপ্পা আতেল ছাত্ররা লাফিয়ে ঊঠে ভাবে বুঝি এ+, বিজ্ঞানীরা হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলবেন- হয়নি, ফেল। ওটা হবে এইচ জি অর্থাৎ পারদ। ৩ শুনলেই তারেকাণু’দার মত মিষ্টি লোকেরা  দুষ্টুমনে ভাবে নিশ্চয় পম্পেই। আর বিজ্ঞানীরা নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ভাবেন- ও আচ্ছা, লিথিয়াম। এখন এই রোল নাম্বার টা এল কোথা থেকে? সেই গল্পটাই শুনি আগে। আমাদের কেটেকুটে টুকরা করলে কি পাওয়া যাবে? কয়েক কেজি মাংস, কিছু হাড্ডি, লিটার কয়েক রক্ত, এইই। তেমনি একটা পরমাণুকে কেটে কুচিকুচি করতে গেলে পাব তিনটে জিনিস- ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন। এর মধ্যে ইলেকট্রন এক্কেবারে হালকা। ইলেকট্রন একটা হামিংবার্ডের মত হলে প্রোটন বা নিউট্রন হবে ম্যামথের সমান। এখন একটা পরমাণুতে যতগুলো প্রোটন থাকে, ঠিক ততগুলোই ইলেকট্রন থাকে (মাঝে মধ্যে দুয়েকটা ছুটে যায় বটে, সে অন্য হিসাব)। আদতে এই সঙ্খ্যাটাই হল পরমাণুর রোল নাম্বার বা “পারমাণবিক সংখ্যা”। লুতেশিয়ামের পারমানবিক সংখ্যা ৭১ মানে তাতে ঠিক ৭১ খানা প্রোটন আছে। কিংবা উল্টোভাবে দেখলে- নাইট্রোজেনে ৭ খানা প্রোটন আছে, অর্থাৎ, তার পারমাণবিক সংখ্যা হবে ৭, ব্যাপারটা এমন। এখন ফরহাদের যেমন শিরি, মজনুর যেমন লাইলী, হয়রানের যেমন স্যাম, প্রোটনের তেমনই ইলেকট্রন। কি বুঝলেন? এখন ইলেকট্রন আর প্রোটন (এবং কাবাব মে হাড্ডি- নিউট্রন) পরমাণুতে কিভাবে পেম-ভালুবাসা করে সেটাই পরমাণুর হাঁড়ির খবর। যেই খবরটাই একেক বিজ্ঞানী একেক সময়ে দিয়ে গেছেন, বিভিন্নভাবে।   

অনেক কাল আগের কথা, যখন মানুষ কেবল ইলেকট্রন আর প্রোটন চিনেছে- সেসময় মানুষের ধারণা ছিল এক রকম। তখন টমসন নামে এক বিজ্ঞানী প্রথম ধারণা করার চেষ্টা করলেন- “পরমানু হল তরমুজের মত”। প্রোটন গুলো হল তরমুজের শাঁস, আর তার মাঝে ছড়িয়ে থাকা ইলেকট্রন গুলো তার বিচি। বিজ্ঞানীরা নাম দিতে পটু, এর একটা গাল ভরা নামও দেয়া হলঃ “টমসনের প্লাম-পুডিং মডেল”, বাংলায় বলতে গেলে কিসমিস-পিঠা মডেল আরকি। কিন্তু টিনটিনের মানিকজোড়ের কথা যেমন কখনওই ঠিক হতনা, দুর্ভাগ্যক্রমে বিজ্ঞানী টমসনের টাও হলনা। তাঁর মডেলে তরমুজ আর তার বিচি মিলে-মিশে একাকার ছিল, এটা বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের মোটেই পছন্দ হলনা। সত্যপীরের গপ্পের নিষ্ঠুর <a href="http://www.sachalayatan.com/mir178/50010" class="bb-url">রাজা-রাজড়ারা</a> যেমন আঙ্গুলের ইশারায় বন্দীদের বিচি আলগা করে দিতেন, রাদারফোর্ডও তাঁর তত্ত্বের এক গুঁতোয় তরমুজের বিচি আলগা করে দিলেন। তবে রাজাদের অস্ত্র ছিল তরবারী, আর রাদারফোর্ডের ল্যাবরেটরী। সেই থেকে মনের দুঃখে পরমাণুতে ইলেকট্রন আর প্রোটন মিলে-মিশে থাকে বটে, তবে ভাই-বোনের মত। 

টেনিস বল দিয়ে বাউন্স-বাউন্স ক্যাচ-ক্যাচ খেলেননি এমন মানুষ বোধহয় ফুটোস্কোপ দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবেনা। সঙ্গী না থাকলেও কুছ পরোয়া নেহি, দেয়াল (হুমায়ুন আহমেদেরটা না, ইটের) হলেই চলে। বল ছুড়ে দাও, ড্রপ খেয়ে ফিরে এলে ধরে ফেলো, এই তো খেলা। এখন সামনে যদি শক্ত নিরেট দেয়াল না থেকে বাঁশের বেড়া কিংবা তারের জাল থাকে, তখন? (ধরে নিচ্ছি বেড়ার ফাঁক কিংবা জালের ফুটো বলের চেয়ে বড়।) দেখা যাবে প্রায় সময়েই বল কিন্তু আর বাউন্স করে ফিরে আসছে না, ফাঁক গলে পেছনে চলে যাচ্ছে, ম্যালা হ্যাপা। এখন যদি এমন হয় যে- পর্দাঘেরা একটা নিরেট দেয়াল আর একটা বেড়া পাশাপাশি আছে। কাছে যাওয়া নিষেধ, তবে ঢিলাঢিলি করার অনুমতি আছে- তাহলে? কিছুক্ষন ঢিল ছুঁড়লেই কিন্তু আন্দাজ পাওয়া যাবে কোনটা দেয়াল আর কোনটা বেড়া। চিকন বুদ্ধির লোকজন থাকলে দেখা যাবে অনেকগুলো ঢিল ছুঁড়ে ঠিক কোথায় কোথায় বাঁশ, আর কোথায় কোথায় ফাঁক সেটাও বের করে ফেলেছে, কাছে না গিয়েও। ঠিক এই কাজটাই রাদারফোর্ড করেন- খালি বাঁশের বেড়ার বদলে ছিল সোনা (ইয়ে, চাটগাঁর চৌধুরী সাহেবের সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই, দুষ্ট লোকেরা তফাৎ যাও)। আর টেনিস বলের বদলে নিয়েছিলেন হিলিয়াম নামের এক জাতের পদার্থের নেংটুপুটু পরমাণু। 

বিজ্ঞানীদের রোলকলের খাতায় হিলিয়াম হল সেকেন্ডবয় বা সেকেন্ডগার্ল (আদতে অবশ্য সে নিরাসক্ত, নির্লিঙ্গ)। অর্থাৎ, তার ভান্ডারে আছে ২ টা ইলেকট্রন আর ২ টা প্রোটন এবং কাকতালীয় ভাবে ঠিক ২ টা নিউট্রন। এখন তা থেকে গুঁতোগুঁতি করে ২ খানা ইলেকট্রন যদি ঝেড়ে ফেলে দেয়া যায়, তখন বাকিটুকুর নাম হয় “আলফা কণা”। এতে থাকে ২ খানা প্রোটন আর ২ খানা নিউট্রন। এই নেংটুপুটু হিলিয়াম বা আলফা কণাই হল রাদারফোর্ডের টেনিস বল। এজন্য তাঁকে অবশ্য জোরপুর্বক হিলিয়ামকে নেংটু করতে হয়নি। সমাজে হেলিকপ্টার বাবার মত কিছু লুলপুরুষ আছেন না, নিজের মা কিংবা বোনের ছায়াটা দেখলেই এঁদের আধহাত জিভখানা বেরিয়ে এসে অঝোর ধারায় লালা পড়তে থাকে। (সম্পুর্ণ সজ্ঞানে দুনিয়ার বাদবাকী নারীসমাজকে আপাতত উনাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখলাম।) তেমনি প্রকৃতিতেও কিছু লুলপরমাণু আছে। দিন নাই রাত নাই এদের থেকে লালার মত অঝোর ধারায় আলফা কণা বেরুচ্ছে তো বেরুচ্ছেই। এই জাতের লুল পদার্থদের সাহায্য নিয়েই রাদারফোর্ড তাঁর এই ঐতিহাসিক গবেষণাটি করেন। তিনি দেখেন অধিকাংশ আলফা কণাই সটান সোনা ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, অল্প কিছু ডাইনে-বাঁয়ে বেঁকে যাচ্ছে, আর তার থেকেও অল্প কয়েকটি ধাক্কা খেয়ে উল্টো দিকে ফিরে আসছে। অর্থাৎ পরমাণু মোটেই দেয়ালের মত নিরেট না, বেড়ার মত ফাঁকযুক্ত। এই থেকে রাদারফোর্ড সিদ্ধান্তে আসলেন পরমাণুর ছোট্ট একটু কেন্দ্রে নিউট্রন-প্রোটন গলাগলি করে থাকে, আর মনের দুঃখে ইলেকট্রন তার চারপাশে বিশাল জায়গা নিয়ে কেবলি ঘুরপাক খায়। অর্থাৎ তার মাঝে অধিকাংশ জায়গাই ফাঁকা। ব্রুণো বা গ্যালিলিওর যুগ তখন বাসী হয়ে গেছে, কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক সৌরজগতের মডেল ততদিনে প্রতিষ্ঠিত। রাদারফোর্ডের মাথায়ও তাই কেন জানি সৌরজগতের ছবিটাই ভেসে উঠল। তিনি বললেন সৌরজগতের কেন্দ্র যেমন সূর্য, পরমাণুর এক্টুসখানি কেন্দ্র তেমন তার নিউট্রন আর প্রোটন। সুর্যের চারপাশে গ্রহগুলো যেমন যার যার কক্ষপথে পাক খায়, পরমাণুর চারপাশে ইলেক্ট্রনগুলিও ঠিক তাই করে। এটার গালভরা একটা নামও দেয়া হলঃ “রাদারফোর্ডের সোলার মডেল”। 

আগেই বলেছিলাম বোধহয়- বিজ্ঞান সুনির্দিষ্ট কথামালার কোনও অচলায়তন নয়, বরং নিত্য-নতুন জ্ঞানে ঋদ্ধ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এক সচলায়তন। সেই নিয়মে রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলও বেশি দিন টিকল না। (রাগ করলেন বুঝি? অচল জিনিসের গপ্প গছাতে এসেছি? আরে পাকিস্তান দেশটাও তো টেকেনি, অচল মাল, তা বলে পাকিস্তানপর্ব বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসটুকু একবার শোনান দেখি। কি আর করা? সবই পরম্পরা।) যাহোক, সেকালে নিউটন আর ম্যাক্সওয়েল নামে মস্ত বড় দুই বিজ্ঞানী ছিলেন। এর মাঝে নিউটনের হিসাবপত্র দিয়ে সেকালে নড়াচড়া আর গুঁতোগুঁতির যাবতীয় মাপজোখ করে ফেলা যেত। কাকে কত জোরে গুঁতো দিলে কয়টার সময় কোথায় গিয়ে পড়বে- একেবারে নিঁখুতভাবে বের করে ফেলা যেত। আর ম্যাক্সওয়েলের হিসাবপত্র ছিল বিদ্যুৎ আর চুম্বক নিয়ে। বিদ্যুৎ বসে থাকলে কি হয়, দৌড়ালে কি হয়, চুম্বক বসে থাকলে কি হয়, দৌড়ালে কি হয় এই যাবতীয় ঘটনা তিনি মাত্র চার লাইনে বলে দিয়েছিলেন। এখনও পদার্থবিজ্ঞান কিংবা তড়িৎকৌশলের ছাত্রছাত্রীদের “ম্যাক্সওয়েল ইকুয়েশন” নামের এই বিন্দুর মাঝে মহাসিন্ধু হজম করতে হয়। যাহোক, এই জাঁদরেল বিজ্ঞানীর কথামত, ইলেকট্রন যদি গোল রাস্তায় দৌড়াতে থাকে তাহলে অবশ্যই তার শক্তি কমতে থাকতে হবে। অর্থাৎ, তার শক্তি কমলে ঘুরপাক খাবার রাস্তাটাও ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকবে। এমন চলতে থাকলে ছোট হতে... হতে... হতে... ধুম। কি হল? ইলেকট্রন কেন্দ্রে প্রোটনের উপরে ক্রাশল্যান্ড করল। কিন্তু এভাবে মশার কয়েলের মত পাক খেতে খেতে ইলেকট্রন আর প্রোটনের মিলন ঘটলে তো মহা ট্র্যাজেডি- তখন যে পরমাণুই টেকে না। রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল তাই টিকল না। তবে তা একটি গুরুত্বপুর্ণ ধারণা দিয়ে গেল যে পরমাণুর বেশির ভাগটাই ফাঁকা- যেখানে ইলেকট্রন মনের সুখে চরে বেড়ায়। পরের প্রশ্ন এল কিভাবে? ঠিক সেখানেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের শুরু। তবে সেই গল্প পরেরদিন।