আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন!!

আমরা কোন স্প্যাম পাঠাবোনা। ওয়াদা।

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৭, ২০১৪

ব্ল্যাক হোলের সাথে ম্যানহোলের এবং হোয়াইট হোলের সাথে সুড়ঙ্গমুখের মিল আছে- সত্যি কথা কিন্তু!




মগবাজারের দিলু রোড দিয়ে হাঁটছেন। সাথে এমন একজন আছেন যার সঙ্গে ইতোমধ্যেই আপনার মানসিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছেকিন্তু অধিকাংশ সময়ই আপনি বুঝতে পারেন না তার মেজাজ গরম না ঠাণ্ডা। এমন সময় আপনি হুশ্ শ্ করে ঢুকে গেলেন ম্যানহোলে। আপনি জানেনমানুষের শরীর থেকে নির্গত সবকিছু প্লাজমা অবস্থায় থাকে এই ম্যানহোলে। সেগুলোর স্পর্শ পেয়ে আপনার কিছুটা শীত শীত করতে লাগলো। বেরুনোর কোনো উপায়ও দেখছেন না। আপনার সঙ্গীকে যে বলবেন আপনাকে টেনে তুলতেসে উপায়ও নেই। প্রেস্টিজ তো আস্তে আস্তে পাংচার হবেইতার চাইতে বড় কথা আপনার কোনো শব্দই হয়তো সেখান থেকে বেরিয়ে বাকি দুনিয়ার কানে পৌঁছবে না। - এই অভিজ্ঞতা যদি কখনো আপনার হয়ে থাকেনতাহলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যায় ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে আপনার প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা বিশেষজ্ঞপুরুষ হকিং-এর চাইতে অনেক বেশি।

ধরে নিলামউদ্ধার পাওয়ার আশায় আপনি হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে একসময় হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন কী যেনো আপনাকে প্রবলবেগে টেনে নিয়ে যাচ্ছে! নিচে তাকিয়ে দেখলেনমনুষ্যনির্গত প্লাজমাগুলো হঠাৎ করেই প্রবলবেগে আপনাকেসহ ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক জায়গায়যেখানে নিশ্চিত আপনার সঙ্গী আপনার জন্য অপেক্ষা করে বসে নেই এবং তার কিছুক্ষণ পরই আপনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন বেগুনবাড়ি খালের মুখে একটি ভূপাতিত বস্তুরূপে। অবাক হওয়ার কিছু নেইআপনি আসলে পানি নিষ্কাশন পাইপের মাধ্যমে প্লাজমামিশ্রিত অবস্থায় নিপাতিত হয়েছেন পাঁচতারকা হোটেল সোনারগাঁর পাশের ওই খালে। এই যে আপনি হঠাৎ করেই পাইপের মুখ দেখতে পেলেন এবং (আস্তাকুঁড়ে) নিক্ষিপ্ত হলেন প্রবলবেগেসেই অভিজ্ঞতা নিয়েই পৃথিবীর বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের সাথে হোয়াইট হোল থেকে পদার্থ কীভাবে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হয়সে বিষয়ে তর্ক করতে পারেন। আপনি এটাও বলতে পারেনএই মহাশূন্যে ব্ল্যাক হোলের অবস্থান যেমন নিশ্চিতহোয়াইট হোলের অবস্থান তেমনই নিশ্চিত। কেবল অনিশ্চিত যিনি এই লেখাটি লিখছেনতার জ্ঞান সম্পর্কে।

*

নিউটনের সূত্র অনুযায়ীবিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই একে অপরকে টানছে। কিন্তু ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিদ্যার চিরায়ত ধারণার সঙ্গে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু গোলমাল আছে। মস্তিষ্ককে আপাতঃধারণাশূন্য না করে একসঙ্গে ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিদ্যা ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে পড়তে গেলে মস্তিষ্ক উল্টাপাল্টা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। সেটি নিয়ে অবশ্য পরেও আলাপ করা যাবে।

কথা বলছিলাম ব্ল্যাক হোল নিয়ে। সরলভাবে বলা যায়কোনো অতিকায় নক্ষত্র যখন অবিশ্বাস্যভাবে সংকুচিত হয়ে যায় এবং জমাট বেঁধে তার অভিকর্ষণ শক্তিকে বাড়িয়ে নেয় অকল্পনীয়ভাবে- তখন বিজ্ঞানীরা তাকে ব্ল্যাক হোল নামে ডাকেন। এর আকর্ষণ শক্তি এতোটাই মারাত্মক যেআলো পর্যন্ত একে ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে ব্ল্যাক হোলকে দেখা যায় না কখনোইতার রং হয় কালো কিন্তু বুঝা যায় যেসামথিং ইজ রং ইন দ্য গোলক। যেমনএক কেজি ওজনের কোনো বস্তু যদি ব্ল্যাক হোলের মাত্র বিশ ফুট দূরে এনে রাখা যায়তখন সেটির ওজন হয়ে যাবে কমপক্ষে দশ লাখ টন।

বলা হচ্ছে নক্ষত্র অবিশ্বাস্যভাবে সংকুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই অবিশ্বাস্যভাবে সংকুচিত হওয়ার মাত্রা কতটুকুউদাহরণস্বরূপসূর্যের ব্যাস প্রায় দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার। এই বিশালাকার আয়তনকে যদি কোনোভাবে মাত্র দশ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা যায়তাহলে সেটি একটি ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। অন্যদিকেপৃথিবীকেই যদি চেপেচুপে মাত্র দশমিক ৮৭ সেন্টিমিটার বানানো যায়তাহলে পৃথিবীও একটি ক্ষুদে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে।

ব্ল্যাক হোলে যে সব জিনিস প্রবেশ করে- বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন- সেগুলো পাক খেতে খেতে প্রবেশ করার সময় ব্ল্যাক হোলের বিপুল অভিকর্ষ ক্ষেত্রের প্রভাবে প্রচণ্ড গতিশক্তি অর্জন করে। এই শক্তির আবার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিকিরণে রূপান্তরিত হয়কিন্তু হয়তো তাপ উৎপন্ন হয় না। ফলে ব্ল্যাক হোলের মাঝখানে একটি শীতল পরিবেশ বিরাজ করতে পারে। সাধারণত বস্তুর মধ্যে যতোটুকু শক্তি থাকেতার পুরোটাই নির্গত হয় এবং আমাদের কল্পসীমার বা ধারণারও বাইরে- এমন শক্তি নির্গত হয়। আমরা যখন চুলায় কাঠকাগজকয়লা কিংবা পাতা দিয়ে রান্না করিতখন সেগুলোর এক অংশ আলো ও তা উৎপন্ন করে এবং বাকি অংশ অব্যবহৃত রয়ে যায়। যে কারণে একই কয়লা দিয়ে কয়েকবার রান্না করা সম্ভব। এই বিরাট অংশ অব্যবহৃত হয়ে যাওয়ার কারণেই এসবের উপজাত হিসেবে চুলা থেকে ছাই বা কয়লা পাওয়া যায়। যদি বস্তুর পুরো অংশটিই শক্তিতে রূপান্তরিত হতোতাহলে সেগুলো পুড়ানোর পর আর কিছই অবশিষ্ট থাকতো না।

ব্ল্যাক হোল যেমন সবকিছুকেই ভেতরের দিকে টেনে নিচ্ছেস্বাভাবিক গাণিতিক নিয়মানুসারে এমন কিছু থাকার কথা যেগুলো সবকিছুকেই বাইরের দিকে উগরে দিচ্ছে। এই চিন্তাভাবনা থেকেই বিজ্ঞানীরা মনে করেনমহাশূন্যে ব্ল্যাক হোলের বিপরীতধর্মী হোয়াইট হোলের অস্তিত্ব বিরাজমান। তারা মনে করেনব্ল্যাক হোলে পজিটিভ গ্র্যাভিটির চাপে যতোটুকু সংকুচিত হয়ে বস্তু ভেতরে প্রবেশ করছেঠিক ততোটুকু নেগেটিভ গ্র্যাভিটির চাপে অন্য একটি দ্বার দিয়ে সেগুলো বেরিয়ে যাচ্ছেযাকে হোয়াইট হোল বলা যেতে পারে। এই সূত্রানুসারে অনেক বিজ্ঞানী রহস্যময় কোয়াসারগুলোকে হোয়াইট হোল বলে মনে করেন।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সের বদৌলতে ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলেও হোয়াইট হোল নিয়ে বিজ্ঞানীদের চিন্তা কমছেই না। মহাশূন্যে বিশাল জায়গা নিয়ে শত শত গ্যালাক্সির ঔজ্জ্বল্য নিয়ে যে সব বস্তু ঘুরছেসেগুলোকে কোয়াসার বা হোয়াইট হোল নাম দিলেও তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্ল্যাক হোলের চারপাশে গ্র্যাভিটন দিয়ে তৈরি গ্র্যাভিটি যেমন আলোকে নিজের দিকে টেনে নেয়তেমনি কোনো প্রমাণ হোয়াইট হোলের সপক্ষে বিজ্ঞানীরা এখনও পান নি। ফলে বস্তুআলোরেডিও তরঙ্গ বা চুম্বকীয় তরঙ্গ যেমন বিলীন হয়ে যায়তেমনিভাবে সেটা যে ফিরে আসে সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো এখনো কোনো দৃঢ় প্রমাণ পান নি বিজ্ঞানীরা।

একটু আগেই বলা হয়েছেব্ল্যাক হোলের ভেতরের পরিবেশ হবে শীতল। কিন্তু সেখানেও বড়সড় বিভ্রান্তি আছে ক্ল্যাসিক্যাল ফিজিক্স এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কারণে। ব্ল্যাক হোল যদি সূর্য কিংবা এরকম বড় সাইজের নক্ষত্রের থেকে উৎপত্তি হয় তাহলে তার অবস্থা হবে ভয়াবহতম শীতল। অন্যদিকে যদি সাইজ হয় প্রোটনের মতোতাহলে তার তাপমাত্রা এতোটাই বেশি হবে যেসেই তাপমাত্রা কথা চিন্তা করাও দূরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের সবচাইতে কাছের ব্ল্যাক হোল সিগনাস এক্স-১কে বলা হয় মহাশূন্যের শীতলতম জায়গা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছেব্ল্যাক হোল টিকে থাকে কয়দিনস্টিফেন হকিং মনে করেনছোট ছোট ব্ল্যাক হোলগুলোর আয়ু কমযেখানে বড়গুলো আমাদের সময়ের হিসেবে প্রায় অনন্তকাল টিকে থাকবে। তবে যদি এমন হয়নক্ষত্রগুলো আস্তে আস্তে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়ে গায়ে গায়ে লেগে যাচ্ছেতাহলে একসময় পুরো মহাশূন্যই ব্ল্যাক হোলময় হয়ে যাবে। এবং এখানেই মহাশূন্যের ইতিহাসের সমাপ্তি।

যারা হোয়াইট হোল তত্ত্বে বিশ্বাস করেনতারা কিন্তু মনে করেন এখানেই মহাশূন্যের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটবে না। কারণ বস্তুগুলো হোয়াইট হোলের মাধ্যেম বিচ্ছুরিত হয়ে অপরপ্রান্তে (যদিও মহাশূন্যের অপরপ্রান্ত বলে কিছু আছে কি-নাসেটি আরেক বিতর্কের ব্যাপার) গঠিত হবে নতুন নতুন নক্ষত্র। আবার সৃষ্টি হবে নতুন মহাশূন্যনতুন পৃথিবীনতুন প্রাণ।



পরীক্ষাগারে বিগ ব্যাং: উত্তর মিলবে অনেক প্রশ্নের...




সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের চেহারা কেমন ছিল- মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন এটি। এই মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নের উত্তর পেতে বিজ্ঞানীরা ব্যয় করেছেন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। মহাবিশ্বের আদিরূপের চেহারা জানার প্রচেষ্টায় বিজ্ঞানীরা আজ উন্মুখ বিলিয়ন বছর আগের চেহারা থেকে বর্তমান পৃথিবীর হারানো রূপ কিংবা সে সময়কার কিছু বস্তুর ধর্ম এবং আচরণ নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। এর একটি তাত্ত্বিক উদ্যোগ হচ্ছে পৃথিবীর সেই আদিরূপ পরীক্ষাগারে সৃষ্টি করা যায় কি-না। কিন্তু শঙ্কা হচ্ছে, এতে করে নাকি পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সত্যিই কি তাই?

ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিএকবার এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেটি হয়েছিলো কিনা জানা নেই। তাত্ত্বিকভাবে এই পরীক্ষার কর্মপদ্ধতি হতে পারে এরকম। পরীক্ষার প্রথমে একটি গোল্ডের পরমাণুর দুটি নির্দিষ্ট ইলেকট্রন নিয়ে পরীক্ষাটির পর্যায়ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হবে। পরমাণু দুটিকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে স্থাপন করে পরস্পরের দিকে তীব্র বেগে ধাবিত করে সংঘর্ষ ঘটানো হবে। এই বেগ হবে আলোর বেগের ৯৯ দশমিক ৯৯৫ শতাংশ। ফলে সৃষ্টি হবে তীব্র তাপ। ধারণা করা হয়, এই তাপের মাত্রা হবে সূর্যের কেন্দ্রের চেয় কমপক্ষে ১০ হাজার গুণ বেশি অর্থাৎ কমপক্ষে ট্রিলিয়ন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এ সময়ে বিশ্ব সৃষ্টির মুহূর্তে যে ধরনের কিছু মৌলিক ও অতিমৌলিক কণা ছিল সেগুলোর পুনরুৎপত্তি হবে। এই কণাগুলো সৃষ্টির ১ সেকেন্ডের ১০ হাজার মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আবার এমন কিছু অতিমৌলিক কণাও বেরিয়ে আসতে পারে যার সঙ্গে হয়তো বিজ্ঞানীরা এখনো পরিচিতই নন। কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক এবং গ্লুয়ন নামের এই কণাগুলো প্রচুর তাপও সৃষ্টি করবে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই কণাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারলে সৃষ্টি মুহূর্তের অনেক রহস্যের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

এই ধরনের পরীক্ষা কি নিরাপদে করা সম্ভব? অনেকে মনে করেন, এই পরীক্ষার মুহূর্তে গবেষণাগারেই একটি ক্ষুদে ব্ল্যাক হোলের সৃষ্টি হতে পারে কিংবা ধ্বংসকণাজাতীয় কতোগুলো পদার্থ সৃষ্টি হতে পারে বা রিলেটিভিস্টক আয়ন কলিডার মহাবিশ্বকে লোয়ার ভ্যাকুয়াম অ্যানার্জি স্টেটে পরিণত হতে পারে, যার একটিই পরিণতি- পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।

এই আশংকার জবাবে বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে, তাত্ত্বিকভাবে এরকমটা মনে করা অসঙ্গত নয়। কিন্তু ঘর্ষণকৃত দুটি কণার আয়তন এতো ছোট যে অনায়াসে এগুলোকে সাব-মাইক্রোস্কোপিক আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। আর এদের সংঘর্ষে যে বল সৃষ্টি হবে তা সর্বোচ্চ হতে পারে কাঁচের গায়ে মাছির ধাক্কার সমান। আর যে পরিমাণ আয়তনের মধ্যে এই বল এবং তাপমাত্রা সৃষ্টি হবে তা এক মিলিমিটারের এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগের সমান যা দিয়ে কোনো ছোটখাটো বিস্ফোরণ ঘটানোও সম্ভব নয়। সুতরাং এর মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

আমরা জানি যে, পরমাণু গঠিত হয় নিউট্রন, প্রোটন ও ইলেকট্রন দিয়ে। পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রন একত্রে থাকে এবং ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু পরমাণুতে এগুলো ছাড়াও নিউট্রিনো, পজিট্রন, মেসন ইত্যাদি কণা রয়েছে যেগুলোর অস্তিত্ব সাধারণভাবে ধরা যায় না। অন্যদিকে সৃষ্টি মুহূর্তে অর্থাৎ মহাবিস্ফোরণের সময় কোয়ার্ক বা গ্লুয়নের মতো অনেক কণাই ছিলো যেগুলো হারিয়ে গেছে চিরতরে। এই পরীক্ষায় হারিয়ে যাওয়া এরকম অসংখ্য কণার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা সহজ হবে। এপক্ষের বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুনভাবে সৃষ্টি হওয়া এই কণাগুলো কোনোরকম বিপর্যয় সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না। সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো প্লাজমা অবস্থায়ও থাকতে পারে। তাঁরা এটাও বলেছেন, আইনস্টাইনের সূত্রের তাত্ত্বিক প্রয়োগানুসারে, এক মিটার লম্বা একটি দণ্ডকে আলোর বেগের কাছাকাছি যেমন শূন্য দশমিক নয় সি বেগে ছাড়লে তা পর্যবেক্ষকের কাছে শূন্য দশমিক ৪৩ মিটার মনে হবে। এ থেকে ধারণা করা যায়, যে বস্তুর আয়তনই আমাদের শক্তিশালী ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, পর্যবেক্ষণকালে এটিকে কতো ক্ষুদ্র দেখা যাবে! আর যদি ক্যামেরার দৃষ্টিশক্তির নির্দিষ্ট মানের উপরে উঠতে না পারে, তাহলে কোনো বস্তুর পক্ষে সামান্য বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়।

অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, এই পরীক্ষা করা সম্ভব হলে আদপে লাভ হবে আমাদেরই। কারণ সৃষ্টির আদি মুহূর্তে অর্থাৎ ১৩ বিলিয়ন বছর আগে বিলীন হয়ে যাওয়া কণাগুলোর ধর্ম বা প্রকৃতি কেমন ছিলো সেটা খুব সহজেই জানা যাবে। এই পরীক্ষা করার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা আরো যুক্তি দেখিয়েছেন। যারা মনে করেন সংঘর্ষ মুহূর্তে প্রোটন এবং নিউট্রন নিউক্লিয়াস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, তাদের উদ্দ্যেশে পক্ষের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মুহূর্তে পৃথিবীর অবস্থা উঞ্চ নয়। ফলে প্রোটন এবং নিউট্রন আলাদা হলেও এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে সেগুলো নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাবে। আবার মুক্ত কোয়ার্ক এবং গ্লুয়ন কণাগুলো এক সেকেন্ডের মিলিয়ন-ট্রিলিয়ন সময়ের মধ্যে ফ্রিজ আউট হয়ে যাবে।

বিপক্ষের বিজ্ঞানীর এটাও মনে করছেন, এই সময়ে কিছু এমন কণাও সৃষ্টি হতে পারে যেগুলো সবকিছু ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা এগুলোর নামও দিয়েছেন- স্ট্রেঞ্জলেট কণা বা ধ্বংসকণা। তাদের ধারণা, এই কণার সংস্পর্শে আসামাত্র যেকোনো কিছু ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। আর যদি ধ্বংস নাও হয় তাহলে সেগুলো অন্য যেকোনো পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।

পক্ষের বিজ্ঞানীরা এর উত্তর দিয়েছেন। তারা বলছেন, আমরা যদি স্ট্রেঞ্জলেট কণার অস্তিত্ব ব্যবহারিকভাবে স্বীকার করি তাহলে আমাদের প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে যে অকল্পনীয় স্বল্পশক্তির অবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব কিনা। এই মুহূর্তে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যে, সেটি করা সম্ভব নয়। আবার সৃষ্টি করা সম্ভব হলে তাত্ত্বিকভাবে সেগুলো ধ্বংস করার মতে সময় ও ক্ষেত্র সৃষ্টি হতে হবে। সেটিও সম্ভব বলে আমাদের কাছে মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, স্ট্রেঞ্জলেট কণা ধনাত্মক চার্জবিশিষ্ট হবে তা পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিকতা অনুসারে অসম্ভব। যদি ধরে নেওয়া হয় তাও সম্ভব, তাহলে এর দ্বারা ধ্বংসাত্মক কোনো কাজ সংগঠিত হবে না। কারণ এই স্ট্রেঞ্জলেট কণা সৃষ্টি হওয়ামাত্র ঋণাত্মক ইলেকট্রন কণা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে সেগুলোকে নিস্ক্রিয় করে ফেলবে। সুতরাং এই আশঙ্কাটিও এখানে অপ্রযোজ্য।

পক্ষের বিজ্ঞানীরা এটাও বলছেন, এ উপায়ে পৃথিবী ধ্বংস তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী সর্বনিম্ন শক্তিদশায় না থাকে। বর্তমানে পৃথিবী সর্বনিম্ন শক্তিদশায় আছে। সেক্ষেত্রে রিলেটিভিস্টিক আয়ন কলিডার আরো কম মাত্রার শক্তিদশা সৃষ্টি করে মহাবিশ্বকে আরো অনেক আগেই ধ্বংস করে ফেলতে পারতো। সুতরাং এ ব্যাপারেও চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানীরা এই যুক্তিও দেখিয়েছেন, এই ধরনের সংঘর্ষ মহাবিশ্বে প্রায়ই নানা মাত্রায় ঘটছে। কিন্তু কোথাও ধ্বংসের খবর পাওয়া যায় নি। তাদের মতে, রিলেটিভিস্টিক আয়ন কলিডারের চেয়ে শতগুণ শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও এই ধরনের সংঘর্ষের শক্তিমাত্রা খুবই কম।

নিউ ইয়র্কের ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অনেক আগেই এই সংঘর্ষসৃষ্টিকারী রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কলিডার মেশিনে চারটি ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। এর প্রতিটিই ইলেকট্রনের প্যাকেট দিয়ে ঘেরা এবং প্রতি সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হাজারের মতো কণার যাবতীয় তথ্য রেকর্ড করা থাকবে। ডিটেক্টরগুলো প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার ২৪ গিগাবাইট বা এক টেরাবাইট তথ্য সঞ্চালন করতে সক্ষম। কণাগুলোর তথ্য ৩০ হাজার শক্তিশালী কম্পিউটারে ধারণ করা হবে।

তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এসব ডাটা গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হবে কোয়ার্ক ও গ্লুয়নের প্লাজমা অবস্থা নিয়ে। এ অবস্থা কোনোভাবেই দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে না। বিজ্ঞানীর আশাবাদী এটুকুই যে, এই প্লাজমা শক্তিশালী গামা রশ্মির ঝলক সৃষ্টি করবে যা দিয়ে তারা কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবেন।


পর্যায় সারণীর ১০৯টি মৌলিক কণার মধ্যে এই ধরনের পরীক্ষণ কোনো নতুন সংযোজন ঘটাবে কিনা তা অবশ্য এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে যা-ই হোক না কেন, পৃথিবীতে এই ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব হলে তা আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারে কিছু না কিছু সংযোজন ঘটাবে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষা নিয়ে যারা বেশ কয়েকবছর ধরে কাজ করছেন তাদের মধ্যে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী জন হ্যারিস, টিম হলম্যান, ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটির পরিচালক জন মারবার্গব উল্লেখযোগ্য।



সুপারনোভা: প্রকৃতির এক অজানা রহস্য!!



p11
সুপারণোভা একধরনের নাক্ষত্রিক বিস্ফোরন যা প্রচন্ড উজ্জ্বল এবং এত বেশি আলো উদগিরিত করে যে তা একটি সম্পূর্ণ গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতাকে প্রায়ই ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থা কয়েক সপ্তাহ বা মাস ব্যাপী চলে। এত অল্প সময়ে একটি সুপারনোভা এত বেশি শক্তি নির্গত করতে পারে যে তা আমাদের সূর্য হয়ত তারা সারাজীবনেও নির্গত করতে পারবেনা।
সুপারনোভা বিস্ফোরনের সময় এর অ্ভ্যন্তরস্ত তারার সমস্ত পদার্থকে সেকেন্ড প্রায় ৩০০০০ কি.মি বেগে বাহিরের দিকে ছুড়ে মারে। আসে পাশে অবস্থিত সকল আন্ত-নাক্ষত্রিক মাধ্যমগুলোতে প্রচন্ড শক ওয়েব বয়ে নিয়ে যায়। এ শক ওয়েব কয়েক আলোক বর্ষ দূর পর্যন্ত সুপারনোভা বিস্ফোরনের ধূলাবালি ও ধোয়া বয়ে নেয়।
p2
সুপারনোভার বিস্ফোরন সাধারণত দুইভাবে ঘটে। নক্ষত্রগুলো সাধারণত নিজেদের অভ্যন্তরে চলমান প্রচন্ড নিউক্লিয়ার ফিউশানের ফলে উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হতে চেষ্টা করে অপর দিকে নক্ষত্রগুলোর নিজস্ব মহাকর্ষ বল এদের বহির্ভাগকে টেনে কেন্দ্রের দিকে নেয়াৱ চেষ্টা করে। এ দুটি বলের ভারসাম্যের কারনেই প্রকৃত পক্ষে কোন নক্ষত্র টিকে থাকে। কিন্তু যখন নক্ষত্রের অভ্যন্তরের নিউক্লিয়ার ফিউশান চলার মত আর কোন জ্বালানি থাকে না তখন এটি প্রচন্ড বেগে নিজের মহাকর্ষের টানে চুপষে যেতে থাকে ফলে প্রচন্ড বিস্ফোরেনের মাধ্যমে এর বাহিরের পদার্থগুলোকে বের করে দেয়। এ বিস্ফোরনই সুপারনোভা।
আমাদের মিল্কি-ওয়ের মত সাইজের গ্যালাক্সিতে প্রতি ৫০ বছরে একটি করে সুপারনোভা সংঘটিত হতে পারে।
p3
১৮৫ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম একজন চাইনিজ জোতর্বিজ্ঞানী সুপারনোভা পর্যবেক্ষন করেন। আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল সুপারনোভা ছিল SN1006। সবচেয়ে বেশি পর্যবক্ষনকৃত সুপারনোভার নাম SN1054(উপরের চিত্রে)। আমাদের গ্যালাক্সিতে সবশেষ সংঘটিত দুটি সুপারনোভা SN 1572 ও SN 1604 খালি চোখেই দেখা গিয়েছিল।যা ইউরোপের জোতির্বিজ্ঞানে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল কারন তারা এরিস্টটলের মত মনে করত চাঁদ এবং গ্রহগুলোর বাহিরের অপরিবর্তনশীল।
p4
প্রতিটি সুপারনোভার নামের প্রথমে SN এবং পরবর্তিতে বছরের নাম এবং তার সাথে বিভিন্ন ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়। বছরের প্রথম ২৬টি আবিষ্কৃত সুপারনোভার নামের সাথের A থেকে Z পর্যন্ত বড় হাতের অক্ষর বসানো হয়। পরবর্তিতে আবিষ্কৃত সুপারনোভাগুলোর নামের সাথে ছোট হাতের অক্ষর জোড়ায় জোড়ায় অর্থাৎ aa,ab,ac এভাবে ব্যবহৃত হয়। এখন প্রায় প্রতিবছরই প্রচুর সুপারনোভা আবিষ্কৃত হয়। ২০০৫ সালে ৩৬৭টি, ২০০৬সালে ৫৫১টি, ২০০৭ সালে ৫৭২টি সুপারনোভা আবিষ্কৃত হয়েছিল।
সুপারনোভাকে এদের বর্ণালীতে আলোর শোষনের উপর ভিত্তি করে দুইভাবে ভাগ করা হয়। যদি কোন সুপানোভার বর্ণালীতে আলোর শোষণ হাইড্রোজেনের কারনে হয় তাহলে এটি Type II সুপারণোভা অণ্যক্ষ্রত্রে সুপারনোভাগুলো Type I ধরনের।Type I এবং Type II এর মাঝেও আরো প্রকারভেদ রয়েছে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এ টিউনটি সাধারণ পাঠকদের বোঝার জন্য একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে তাই আমি আর প্রকারভেদগুলো সম্পর্কে লিখলাম না।
p5
সুপারনোভা এত প্রচন্ড শক্তিশালী যে, পৃথিবীর কাছাকাছা এ ধরনের বিস্ফোরন হলে পৃথিবীর কি হত বলতে পারেন কি ? এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে ৪৪৩.৭ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটে প্রায় ১০০ আলোক বর্ষের কিছু কম দূরত্বে একটি সুপারনোভার বিস্ফোরন হয়েছিল।যার ফলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের উপরিভাগে প্রচন্ড গামা রশ্নির কারনে নাইট্রোজেন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নাইট্রোজেন অক্সাইডে রুপান্তরিত হয়ে যায় এবং ওজন স্তর ক্ষয়ে গিয়ে পৃথিবী সূর্যের অতিবেগুনী রশ্নি এবং অণ্যন্য মহাজাগতিক রশ্নির জন্য উন্মোক্ত হয়ে পড়ে। যা পৃথিবীতে বয়ে এনছিল অর্ডোভিসিয়ান অভিশাপ। যার কারনে পৃতিবীর সমুদ্র থেকে প্রায় ১০০ সামুদ্রিক পরিবার(শ্রেণীবিন্যাসের ধাপ)বিলুপ্তিসহ প্রায় ৬০% সাম্রদ্রিক প্রানীর মৃত্যুর কারন হয়ে দাঁড়ায়। যা পৃথিবীর ইতিহাসে কর্ডোভিসিয়ান বিলুপ্তি নামে খ্যাত।
আল্লাহর সৃষ্টির কাছে আমরা কত তুচ্ছ কত অসহায়। আসুন সবাই একবার আল্লাহকে স্মরণ করি।
সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। কারো ভালোলেগে থাকলে দয়া করে মন্তব্য করুন। আপনাদের মন্তব্য আমাকে আরো লিখতে উৎসাহিত করবে।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া।


15
মানুষ সেই সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যেসব স্বপ্ন দেখে আসছে তার মধ্যে আকাশে ডানা মেলার স্বপ্নই সবচেয়ে প্রাচীন। পাখিকে আকাশে উড়তে দেখে মানুষেরও সাধ জেগেছে পাখির মতোই আকাশে অবাধে উড়ে বেড়াতে। তারপর দীর্ঘদিন অনেক মানুষের অনেক কষ্ট, পরিশ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে আজ মানুষ আকাশে চড়ে বেড়াচ্ছে, মহাশূন্য, চাঁদ জয় করে চলেছে তবুও তার সেই প্রাচীনতম আকাঙ্খার মৃত্যু হয়নি। সে চায় আরও দৃপ্ত, নিরাপদ, সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে আকাশে ডানা মেলতে। আর এজন্য যথারীতি চলছে বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টা কিভাবে আকাশ আরও নিরাপদ, আনন্দদায়ক ও দ্রুত করা যায় তার জন্য। আর বিজ্ঞানীদের নিরলস চেষ্টায় প্রতিনিয়তই নতুন নতুন সাফল্য এসে ধরা দিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে বিশালাকার, দ্রুতগতির ও আরামদায়ক বিমানের। একটা উদাহরণ দেই যেমন- হজ্বের কথাই ধরা যাক। আগে আমাদের দেশ থেকে হজ্বে যাওয়া-আসা মানে ছিল প্রায় বছরের ধাক্কা। আর এখন ? সাধারণ হাজ্বীদের ফ্লাইট সংকটে বেশি সময় লাগে কিন্তু আসা আর যাওয়ার বিমানযাত্রার সময়টা ১০/১২ ঘণ্টার বেশি নয়।
01
এই আধুনিক উড়োজাহাজের আবিষ্কার কিন্তু বেশিদিন আগে হয়নি। বলা যায় আজ থেকে ১০০ বছর আগে উড়োজাহাজ ভূমিষ্ঠ হয়েছে মাত্র। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও এই উড়োজাহাজ আকাশে ডানা মেলতে পারেনি। তবে এর শুরু কবে ? মানুষের আকাশে উড়ার বাসনাকে বাস্তবে রূপদানের চেষ্টার। সূচনা কিন্তু হয়েছে অনেক প্রাচীনকালেই। মানুষের দীর্ঘকালের আকাশে উড়ার স্বপ্ন, প্রচেষ্টা, পরীক্ষা, ত্যাগ, সাফল্যের সমন্বয়ই আজকের আধুনিক উড়োজাহাজ। আসুন একটু শুরু থেকেই দেখে আসি উড়োজাহাজের আবিষ্কারের কাহিনী ও এর পেছনের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ।

প্রাচীন রূপকথা থেকে শুরু

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ উড়বার জন্য যে কতটা ব্যাকুল ছিল তা বোঝা যায় বিভিন্ন প্রাচীন উপকথার দিকে তাকালেই। সেখানেও বিভিন্নভাবে এসেছে মানুষের আকাশে ভ্রমণের কথা। গ্রীক পুরানের একটি গল্প আমাদের অনেকেরই জানা। অনেক অনেক আগে ডিডালুস ও তার ছেলে ইকারাস পাখির পালক দিয়ে ডানাসদৃশ বস্তু তৈরি করে তা মোম দিয়ে পরস্পরকে দিয়ে নাকি আকাশে উড়তে সক্ষম হয়েছিল।
03
এভাবে এক সময় ইকারাস বেশি উপরে উঠে গেলে সূর্যের উত্তাপে তার ডানার মোম গলে গেলে তা থেকে থেকে পালক খসে পড়ে গেলে সে নদীতে পড়ে যায়। গ্রীকরা যে শুধু রূপকথা নিয়েই পড়ে ছিল তা কিন্তু নয়। এই গালগপ্পোকে বাস্তবে রূপ দিতেও তাদের দেশে সেই সময়ে অনেকেই কাজ করে গেছেন। আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ সালে আর্কিটাস , যিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, গণিতবিদ, জ্যোতিষি তিনি প্রথম উড়ুক্কু মানের ডিজাইন ও মডেল নির্মাণ করেছিলেন এবং এটি নাকি ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম হয়েছিলে। তিনি এই যন্ত্রের নাম দিয়েছিলেন পিজিয়ন ।

প্রাচীন চীনে বেলুন আর ঘুড়ির নিদর্শন

তবে উড়বার আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপদানের চেষ্টার প্রাচীনতম নিদর্শন আমরা দেখতে পাই প্রাচীন চীনদেশে। সেখানে কিংমন ঝুং লিয়াং (১৮০-২৩৪ খ্রীষ্টাব্দ) গরম বাতাস ব্যবহা রকরে সর্বপ্রথম বেলুন উড়িয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর জেনারেল এবং যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষকে ভয় দেখাতে তিনি এই বেলুন ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। একটি বড় কাগজের ব্যগের নিচে তেলের বাতি জ্বালিয়ে তিনি এই বেলুন উড়াতেন। শত্রুপক্ষ ভাবতো যে আকাশ থেকে কোনো মহাশক্তিধর কেউ তাদের বিপড়্গে লড়তে এসেছে। তবে আবার আরেক ইতিহাসবিদ জোসেফ নিধাম-এর মতে চীনের মানুষ আরও আগে (খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ) থেকেই গরম বাতাস দিয়ে কাগজের বেলুনের ব্যাপারে জানত।
16
এরপর ৫ম শতাব্দীতে এসে চীনের লু বান কাঠের কাঠামো ব্যবহার করে দীর্ঘাকৃতির ঘুড়ি বানান। তবে অনেকেই একে আধুনিক গ্লাইডারের আদিরূপ মনে করেন। ১৩শ শতাব্দীতে কুবলাই খানের শাসন আমল থেকে শুরু হয় বিভিন্ন উৎসবে রঙিন ফানুসের ব্যবহার। কালের পরিক্রমায় পরবর্তীতে মঙ্গোলিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, তিব্বত ও ভারতবর্ষেও এর প্রচলন দেখা যায়। আর সম্ভবত মানুষের প্রথম আকাশে উড়ার ইতিহাসও সৃষ্টি হয়েছিল এই চীনেই। ৫৫৯ সালে চীনের নদার্ণ উই রাজ্যের রাজধানী উই-এর একটি উঁচু প্রাসাদের উপর থেকে বিশালাকৃতির ঘুড়ির সাথে নিজেকে বেঁধে আকাশ ভ্রমণ করেন তৎকালীন রাজার ছেলে উয়ান হুয়াংতাও।

মুসলিম খলিফাদের আমলের প্যারাসুট ও গ্লাইডার

মুসলিম খলিফাদের শাসনামলেও বিভিন্ন সময়ে আকাশে উড্ডয়ন স্বপ্ন বিভিন্নভাবে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করতে থাকে অনেকেই। আমির আব্দুর রহমান (দ্বিতীয়) এর সময়ে তার সহায়তায় বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী আব্বাস ইবনে ফিরনাস আকাশে উড়বার বেশ কিছু প্রয়াস চালান। ৮৫২ সালে তিনি কাঠ, কাপড় ও পশমের তৈরি কাঠামো দিয়ে উড়বার উপযোগী ডানাসদৃশ বস্তু তৈরি করেন। এটি দেখতে কিছুটা ছাতার মতো হয়েছিল। এরপর তিনি তৎকালীন করডোবার (স্পেন) গ্র্যান্ড মসজিদের উঁচু মিনার থেকে লাফ দেন এবং বেশ সফলতার সাথে মাটিতে নেমে আসেন। এই ডানাকেই বর্তমানের আধুনিক প্যারাসুটের আদিরূপ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।
06
এর ২৫ বছর আরও অনেক উন্নত গবেষণার পর আবার জাবাল আল-আরস পাহাড়ের উপর থেকে গ্লাইডার সদৃশ কাঠামো নিয়ে লাফ দেন। কিন্তু এবার এটি বিদ্ধস্থ হয়ে তিনি আহত হয়েছিলেন। কেননা এতে ভারসাম্য রক্ষার জন্য কোনো লেজ ছিল না। তবে পরবর্তীতে ১০১০ সালে অনুরূপ সংশোধিত গ্লাইডার ব্যবহার করে ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়বার রেকর্ড আছে।

রেনেসা যুগে অগ্রগতি

এর প্রায় ৬ শতাব্দি পর আরেকটি উন্নত উড্ডয়ন যন্ত্রের চিত্র অংকন করেন শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। তিনি সর্বপ্রথম আকাশে উড়ার একটি তাত্ত্বিক ধারণাও দেন। তার ডিজাইন করা গস্নাইডারে ডানার ভেতরের অংশ ছিল মূল কাঠামোর সাথে শক্তভাবে লাগানো। আর ডানার নড়তে সক্ষম অংশগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য ছিল আলাদা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এর নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ওরনিথপ্টার’।
05
১৪৯৬ সালে তিনি এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। কেননা এ যন্ত্রের সাহায্যে আকাশে পাখির মতো মুক্তভাবে উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন করা সম্ভব ছিল না সেই সময়। অনেকে অবশ্য বাহুবলেই এই যন্ত্রের সাহায্যে উড়তে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই চেষ্টায় কেউ সফল হয়েছে বলে শোনা যায়নি কখনো। কেননা মানুষের বুকের ও কাঁধের পেশীগুলো এই কাজ করার মতো যথেষ্ঠ শক্তিশালী নয়। ভিঞ্চির মৃত্যুর পর অনেকদিন আর আকাশে ডানা মেলার ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
১৬৩০ সালের দিকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ৬২.৫৯ মিটার উঁচু গালাতা টাওয়ার থেকে হিজাফেন আহমেদ সালাবী নামক এক ব্যক্তি নিজের তৈরি উডুক্কু এক যানে করে ৩ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৬৩৩ সালে তার আরেক ভাই হাসান সালাবী সাত ডানার এক রকেটে করে আকাশ উড্ডয়ন করেছিলেন। এর উপরের অংশ ছিল গান পাউডারে পূর্ণ। এটিই মানুষের বানানো প্রথম রকেট বলে মনে করা হয়। তিনি গান পাউডার শেষ হবার পর ডানাগুলোকে প্যারাসুটের মতো ব্যবহার করে নিরাপদেই অবতরণ করেছিলেন। তিনি আকাশে ছিলেন প্রায় ২০ সেকেন্ড আর ৩০০ মিটার মতো উঁচুতে উঠেছিলেন বলে জানা যায়।

বেলুন ভ্রমণের সূচনা

ডানা নিয়ে এতো কিছু করেও তেমন কোনো সফলতা না পেয়ে সপ্তদশ শতকের শেষ দিক থেকে মানুষ নজর দেয় বেলুন দিয়ে আকাশে উড্ডয়নের দিকে। কেননা প্রায় সবাইই সেই সময় জানতো যে, উত্তপ্ত বাতাস সাধারণ বাতাসের চেয়ে হাল্কা, তাই গরম বাতাস কোনো বড় বেলুনে ভরে রাখলে সেই বেলুনটি বাতাসে ভেসে থাকতে সড়্গম। এভাবে গরম বাতাস বেলুনে ভরে ১৭৮৩ সালে মানুষ সর্বপ্রথম আকাশে ভেসে বেড়াতে সক্ষম হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ফ্রান্সে। মন্টগোফিয়র ভ্রাতৃদ্বয়ের আবিস্কৃত বেলুনে চড়ে জেন ফ্রান্সিস ডি রোজিয়ার এবং ফ্রান্সিস লরেন্ট ডি’আরলান্দিস নামক দুই ব্যাক্তি ৮ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। বেলুনে গরম বাতাসের উৎস হিসেবে ছিল কাঠ জ্বালিয়ে পাওয়া ধোঁয়া। ঐ বছরেই হাইড্রোজেন গ্যাস ভর্তি বেলুন নিয়ে মানুষ আকাশ ভ্রমণ করে ফেলে।
07
চিত্রঃ হেনরি গিফার্ডের বেলুন(১৮৫২)
এভাবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে বেলুন ভ্রমণ ইউরোপে বেশ জনপ্রিয় হয়। এ সময়ে উচ্চতা ও দিক পরিবর্তনে সক্ষম এমন বেলুনের উন্নয়ন সাধিত হতে থাকে। এরকম ইঞ্চিনচালিত প্রথম বেলুন যেটি আলোর মুখ দেখেছিল সেটি হচ্ছে হেনরি গিফার্ডের বেলুন। সময়কাল ১৮৫২, দেশ ফ্রান্স। ইঞ্জিন ছিল বাস্পচালিত। তিনি ২৪ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়েছিলেন। আমেরিকায় সিভিল যুদ্ধের সময়তো সেনাবাহিনীর একটি বেলুন ইউনিটই ছিল।
08
চিত্রঃ লা ফ্রান্স এয়ারশীপ,১৮৮৫ সালে তোলা ছবি
এরপর ১৮৮৪ সালে ফ্রান্সেই সেনাবাহিনী কর্তৃক বিদ্যুৎচালিত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বেলুন, ‘লা ফ্রান্স’ উড্ডয়ন করানো হয়। এর নির্মাতা ছিলেন চার্লস রেনার্ড এবং আর্থার ক্রেবস। এটি ছিল ৫২ মিটার উঁচু, এর বেলুনের আয়তন ছিল ৬৬০০০ ঘন ফুট। এটি ৮টি .৫ অশ্বশক্তির বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করে ২৩ মিনিটের মধ্যেই ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম ছিল। এর পর ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধেও বেলুনের ব্যবহার দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে সৌখিন কাজে ও পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য বেলুন ব্যবহৃত হয়।

গ্লাইডার সমাচার

বেলুন হচ্ছে বাতাসের চেয়ে হাল্কা। আর বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো উড়ুক্কু যান সম্পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় ১৭১৬ সালে, ‘স্কেচ অফ এ মেশিন ফর ইন দা এয়ার’। লিখেছিলেন ইমানুয়েল সুইডেনবর্গ। তিনি এই বইয়ে তার ফ্লাইং মেশিনের বর্ণনায় বলেছিলেন এটি হাল্কা কাঠামোর শক্ত ক্যানভাসে ঢাকা একটি যন্ত্র যার দু’টি বড় ডানা ছিল। কিন্তু তিনি জানতেন যে, এই কাঠামো আকাশে উড়বার মতো প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেবার মতো ব্যবস্থা এতে ছিল না। তবে তিনি আশা করেন ভবিষ্যতে কেউ না কেউ এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে।
গ্লাইডার হচ্ছে বাতাসের চেয়ে ভারী উড়ুক্কু যান নির্মানের প্রথম ধাপ। এটি বাতাসের চেয়ে ভারী এক ধরনের ইঞ্জিনবিহীন ডানা ও লেজবিশিষ্ট উড়োজাহাজ। গস্নইডারকে বাহ্যিক শক্তির সাহায্যে একবার উড়িয়ে দিলে বা উঁচু পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়লে এটি তার নিজস্ব বড় ডানায় ভর করে অনেকক্ষণ ধরে বাতাসে ভেসে বেড়াতে সক্ষম।
এরপর ১৭৯৯ সালে স্যার জর্জ ক্যালে প্রথম আধুনিক গ্লাইডারের মডেল উপস্থাপন করেন। এতে আলাদা লেজ ছিল দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য। এই মডেল সর্বপ্রথম আকাশে উড়ে ১৮০৪ সালে। এর পরের অনেক বছর তিনি আরও উন্নত গ্লাইডার আবিষ্কারের জন্য চেষ্টা করে যান। তিনিই সর্বপ্রথম এরোডাইনামিক্সের অনেক সাধারণ সূত্র আবিষ্কার করেন এবং Lift (উত্তোলন বল), Drag (রোধক বল) ইত্যাদি শব্দের সূচনা করেন। তিনি পরে তার গ্লাইডারে গান পাউডার দিয়ে চালিত ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল ইঞ্জিন স্থাপন করেন। পরে অবশ্য এলফন্স পেনাউড নামের আরেক ব্যক্তি জ্বালানী হিসেবে রাবার পাউডার ব্যবহার করে এই ইঞ্জিনকে আরও আধুনিক করে তোলেন। ১৮৫৩ সালে জর্জ ক্যালে তার আবিষ্কৃত গস্নাইডার ব্যবহার করে বেশ সফলতার সাথেই ছোটখাট আকাশ ভ্রমণ করে ফেলেন।
১৯০১ ও ১৯০৩ সালে দুটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইড পরিচালনা করলেও এগুলোর ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা তেমন আশানুরূপ ছিল না। পরে তিনি ৫২ হর্সপাওয়ারের দুটি শক্তিশালী ইঞ্জিন ব্যবহার করে পরীক্ষা চালালেও তার এই মডেল এইক্ষেত্রে সফলতার মুখ দেখেনি; সাথে প্রথম উডুক্কু যান নিয়ে আকাশে উড়বার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
23
অরভিল রাইট
22
উইলবার রাইট
অরভিল রাইট আর উইলবার রাইট নতুন করে তাদের পরিচয় করিয়ে দেবার আর কিছু নেই। উড়োজাহাজের আবিষ্কারক হিসেবে পৃথিবীবাসী চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছে তাদের নাম। তাদের শুরুটাও হয়েছিল গ্লাইডার দিয়েই। তারা সে আমলেই পাঁচ হাত লম্বা আর দুই হাত প্রশস্ত একটি সুড়ঙ্গ (উইন্ড টানেল) তৈরি করে এর মধ্যে দিয়ে প্রবল বেগে বাতাস প্রবাহিত করে বিভিন্ন ধরনের গ্লাইডার সম্ভাব্য সব উপায়ে সেখানে উড়িয়ে দেখেন।
24
চিত্রঃ রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তাদের গ্লাইডার নিয়ে, বামের ছবিটি ১৯০১ সালের পরেরটি ১৯০২ সালের

অবশেষে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন

এরপর তারা আকাশযানের নিয়ন্ত্রণ ও এর উড্ডয়নের শক্তির উৎস কি হবে তা নিয়ে নিরলস গবেষণা করতে থাকেন। এ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে অবশেষে তারা ‘ফ্লায়ার ওয়ান’ নামে একটি উড়োজাহাজ নির্মাণে সক্ষম হন।
12
চিত্রঃ ফ্লায়ার ওয়ানের প্রথম ফ্লাইট, চালকের আসনে অরভিল রাইট, নীচে উইলবার রাইট
পরে এর জন্য উপযুক্ত একটি পেট্রোল চালিত ইঞ্জিন নির্মাণেও তারা সফল হন। অবশেষে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার কিল ডেভিল হিলস-এ ১৯০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তারা ফ্লায়ার ওয়ানের সফল উড্ডয়ন করান। প্রথম ফ্লাইট-এর পাইলট ছিলেন অরভিল রাইট। তিনি প্রথম ফ্লাইটে ১২ সেকেন্ড ৩৭ মিটার পথ পাড়ি দেন। একই দিনের চতুর্থ ফ্লাইটে উইলবার রাইট ৫৯ সেকেন্ডের ফ্লাইটে ২৬০ মিটার পথ পাড়ি দেবার কৃতিত্ব দেখান। চারটি ফ্লাইটই মাটির ১০ ফুট উপর দিয়ে পরিচালনা করা হয়। প্রথম উড্ডয়নে আকাশযানের সামনের রাডার বহনকারী কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূল কাঠামো সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল।
27
চিত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার এন্ড স্পেস জাদুঘরে ফ্লায়ার মডেলটি এখনো সংরক্ষিত আছে
পরের দুই বছর তারা এই আকাশযান নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা চালাতে থাকেন। কোনো অভিযানই অবশ্য মিনিটখানেকের বেশি স্থায়ী হয়নি। তবে ১৯০৫ সালের ১৪ জুলাই এক দূর্ঘটনার পর তারা তাদের ফ্লায়ার-এর মডেল বেশ কিছুটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। তারা তাদের ফ্লায়ারের এলিভেটর ও রাডারের আকার দ্বিগুণ করেন এবং মূল কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন এনে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সংশোধন করেন। নতুন ফ্লায়ারের নাম দেয়া হয় ‘ফ্লায়ার-৩’। ১৯০৫ সালের ৫ অক্টোবর উইলবার রাইট ৩৯ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে ২৪ মাইল পথ পাড়ি দেবার গৌরব অর্জন করেন।
26
চিত্রঃ ফ্লায়ার-৩, ১৯০৫ সালের ছবি
এরপর ১৪ মে, ১৯০৮...উড়োজাহাজ আবিষ্কারের দিন হিসেবে অফিশিয়ালি এটিকেই স্মরণ করা হয়।এ সম্পর্কে অন্য আরেকদিন বিস্তারিত বলব।
১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯০৮ অরভিল রাইট গড়েন মর্মান্তিক এক ইতিহাস। ভার্জিনিয়ার ফোর্ট মেয়ারে সেনাবাহিনীর এক পরীক্ষণের সময় তার উড়োজাহাজ বিধ্বস্থ হলে সহযাত্রী থমাস সেলফ্রিজ মৃত্যুবরণ করেন।
21
চিত্রঃ ১৯০৮ সালে ফোর্ট মেয়ারে দূর্ঘটনার ছবি
এর আগেই অবশ্য রচিত হয়েছিল নতুন এক ইতিহাস। থেরেস পেলচায়ার প্রথম মহিলা যাত্রী হিসেবে আকাশে উড্ডয়নের সৌভাগ্য অর্জন করেন। আর রেমন্ড ডা ল্যারোচে হচ্ছেন প্রথম মহিলা চালক যিনি ১৯০৯ সালের ২২ অক্টোবর আকাশে উড্ডয়ন করেন। তিনিই মেয়েদের মধ্যে প্রথম পাইলটের লাইসেন্স পেয়েছিলেন।
এভাবেই রাইট ভ্রাতৃদ্বয় সারাবিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য। তবে একটি বিষয়ে তারা ভুল করেছিলেন। তারা ঠিকভাবে উড়োজাহাজ উড়াতে পারলেও পারেননি তাদের আকাশযানের ভবিষ্যত নির্ণয় করতে উইলবার রাইট একবার মন্তব্য করেছিলেন-
‘এই উড়োজাহাজ ভবিষ্যতে মানুষের স্থল যোগাযোগের বিকল্প হবে এমনটা আমি বিশ্বাস করি না। আমার ধারণা শুধু বিশেষ উদ্দেশ্যেই এর ব্যবহার সীমিত থাকবে। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। আর ডাক আদান-প্রদানেও এটি কাজে আসতে পারে’ তবে এই ভুল ভবিষ্যতবাণীর জন্য উইলবার রাইটের তেমন কোনো আফসোস আছে বলে আমার মনে হয় না পাঠক। আপনি কি বলেন?
25
চিত্রঃ ১৯১০ সালে রাইট ভাতৃদ্বয় কর্তৃক ব্যবহৃ্ত ইঞ্জিন
**উপরের লিখাটি আমার ‘সহজ করে উড়োজাহাজ’ বই থেকে নেয়া।বইটা আগামী বইমেলায় প্রকাশ হবার কথা রয়েছে।টেকটিউনের জন্য কিছুটা পরিবর্তন করে লিখলাম।যদি টেকটিউনে এই লিখা বই বের আগেই প্রকাশের জন্য কপিরাইটজনিত কোন সমস্যা হবার সম্ভাবনা থাকে তাহলে এডমিন প্লিজ আমাকে জানাবেন।উল্লেখ্য যে এখানে(অনলাইনে) প্রকাশের ব্যাপারে আমার পাবলিকেশন্স থেকে অনুমতি নেয়া আছে।

প্রাপ্তঃ টেকটিউনস 

মহাবিশ্ব ও স্ট্রিং থিউরি – ৩য় পর্ব

জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটি অনুযায়ী মহাবিশ্ব এমন একটি রুপের প্রকাশ করে যা খুব শান্ত। কিন্তু কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সের সূত্র অনুযায়ী সাব এটমিক লেভেলে মহাবিশ্ব খুবই অশান্ত। যা দুইটি থিউরিকে আলাদা করে।
elegant_universe_2_of_8.jpg
স্ট্রিং থিউরি সাব এটমিক লেভেলে মহাবিশ্ব খুবই শান্ত প্রমান করে এবং মহাবিশ্বকে একটি সঠিক রুপ দান করবে সবার ধারনা।
elegant_universe_2_of_4.jpg
স্ট্রিং থিউরির আবিষ্কার একটি আকষ্মিক ব্যাপার।1968 ইটালিয়ান ফিজিসিস্ট গ্যাবরিয়াল ভেনিয়াটসানো (http://en.wikipedia.org/wiki/Gabriele_Veneziano) এমন একটি সমিকরন খুজচ্ছিলেন যা শক্তিশালী নিউক্লিয়ার ফোরস কে ব্যাখা করবে। তিনি 200 বছর পুরাতন একটি বই থেকে আবিষ্কার করেন ওয়লারের গামা ফাংশন (Euler Beta function-http://en.wikipedia.org/wiki/Beta_function) যা মুলত প্রকাশ করে শক্তিশালী নিউক্লিয়ার ফোরস। যার পর তিনি খুব খ্যাতে লাভ করেন। তার এই আবিষ্কারের পর লিউনারড সাসকিন্ড গামা ফাংশন নিয়ে কাজ করেন।
তার গবেষনা শেষে তিনি উপলব্ধি করেন সমীকরনটি এমন একটি কিছু প্রকাশ করছে যার আকার একটি সুতার মত এবং যা নিয়ে টানা টানি করা যায় ইচ্ছে মত। কিন্তু অন্যারা এটিকে অবাস্তব বলে প্রকাশ থেকে বিরত রাখেন।
elegant_universe_2_of_5.jpg
এর মধ্যে শুরু হয় পাট্রিকাল আবিষ্কারের যুগ। প্রতিদিন নতুন নতুন পাট্রিকাল আবিষ্কার হতে থাকে। যা সব ধরনের সূত্রকে সমরথন করে। আর এর মধ্যে আবিষ্কার হয় মেসেনজার পাট্রিকাল। মেসেনজার পাট্রিকালের কাজ হলো এক কনিকা থেকে অন্য কনিকাতে মেসেনজার পাট্রিকাল আদান প্রদানের মাধ্যমে আকর্ষন সৃষ্টি করা।
এসব পাট্রিকাল দিয়ে সব ব্যাখা করা সম্ভব হলেও মহাকর্ষ ব্যাখা করা সম্ভব হয়নি।
elegant_universe_2_of_6.jpg
1973 সোয়ার্জ (http://en.wikipedia.org/wiki/John_Henry_Schwarz) এবং মাইকেল গ্রিন (http://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Green_(physicist)) স্ট্রিং থিউরি নিয়ে আগান। যেখানে অন্যরা থেকে গিয়েছিলো। স্ট্রিং থিউরিতে তখন দুইটি সম্যাসা বিদ্যমান ছিলো। একটি হলো গানিতিক সম্যাসা আর অন্যাটা হলো একটি ভরহীন কনিকা। তাদের নিকট তখন দুই স্ট্রিং থিউরির সমীকরন ছিলো, যা ছিলো একে অন্য থেকে আলাদা। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তারা প্রমান করেন স্ট্রিং থিউরিতে গানিতিক সম্যাসা নেই এবং ভরহীন কনিকা হলো গ্রেভিটন।
(চলবে)

মহাবিশ্ব ও স্ট্রিং থিউরি – ২য় পর্ব

আইনিস্টাইন প্রমান করেন মহাবিশ্বে মহাকষ বল কাজ করে। তার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সমীকরন দারা করানো যেটির মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিস ব্যাখা করা যাবে।
৮ম শতকের দিকে তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বলকে দুটি আলাদা বল হিসাবে ধারনা করা হতো। কিন্তু ম্যাক্সয়েল প্রথম তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বলকে ৪টি সমীকরনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। একত্রিত ভাবে তড়িৎ-চৌম্বক বল
16fb12a4460501093396a5b323cb781d.png
57619c6a86c79e56ac806faf21502c90.png
9cab6787646062d6e658cd1e83ad468f.png
339524641f9792ca409073aa67474224.png
তড়িৎ বল এবং চৌম্বক বল মুলত একটি বলে প্রকাশ করা যায় তা আমরা বুঝতে পারি সাধারন একটি ঘটনা বজ্রপাত থেকে, বজ্রপাতের সময় কম্পাসের অদ্ভুত আচরণ। বজ্রপাতের সময় কম্পাসের কাটা উল্ট পাল্টা ঘুরতে থাকে। কারন কম্পাসের কাটা বজ্রপাত থেকে সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রের কারনে পৃথিবীর সাধারন চৌম্বক ক্ষেত্রের আকষনের প্রভাব মুক্ত হয়।
এটি ছিল উনিফিকেসন বা একটি সাধারন সমীকরন তৈরির একটি বড় সাফল্য। কিন্তু মহাকর্ষ এবং তড়িৎ-চৌম্বক বলকে একটি সমীকরনে আনাছিল অসম্ভব ব্যাপার। কারন তড়িৎ-চৌম্বক বল, মহাকর্ষ বল থেকে বিলিয়ন গুন বড়। মহাকর্ষ বলের কারনে পৃথিবী সূযের চারদিকে ঘুরে। কিন্তু আমারা পৃথিবীর উপর দারিয়ে আছি কারন পৃথিবীর মহাকর্ষ বল আমাদের পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টেনে নিতে পারে না। আমরা মাটির উপর দারিয়ে থাকি। মাটি এবং আমাদের মধ্যকার পরমানুর তড়িৎ-চৌম্বক বল মহাকর্ষ বল থেকে শক্তিশালী। মহাকর্ষ বল, পরমানুর তড়িৎ-চৌম্বক বলকে আতিক্রম করতে পারে না। অর্থাত পারমানবিক পর্যায়ে মহাকর্ষ বল খুবি নগ্ন্য। এতে মহাকর্ষ বল ও তড়িৎ-চৌম্বক বলকে একত্রিত করা কঠিন হয়ে পরে।
22474-004-5cd8f015.gif
১৯২০ সালের দিকে নিলস বোর ও তার সদস্যরা আবিস্কার করেন পরমানু সবচেয়ে ছোট পদার্থ নয়। পরমানু তৈরি ইলেক্ট্রন, প্রোটন এবং নিঊট্রনের সম্নয়ে। আর পুরাতন সব থিউরি ব্যার্থ হয় এসবের ব্যাখা দিতে। এসব নতুন কণিকার ব্যাখা দিতে বৈজ্ঞানিকরা দার করান কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স। কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স মুলত আমাদের একটি ধারনা দেয়, কিভাবে পরমানুর মধ্যকার কনিকাগুল কাজ করে। কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স শুধু সম্ভাবনার পরিমাপ করে। যেমন পরমানুতে একটি ইলেক্ট্রন কোথায় অবস্থান করতে পারে তার সম্ভাব্য অবস্থান কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স নির্ণয় করতে পারে। পদার্থের গঠন, আচরন ও গুন ব্যাখা করা সম্ভব কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সের মাধ্যমে।
১৯৩০ সালের দিকে কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স জনকপ্রিয়তা লাভ করে এবং নানা পরীক্ষা শেষে বেরিয়ে আসে দুইটি নতুন বল। শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বল এবং দূর্বল নিউক্লিয়ার বল। শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বল প্রোটন ও নিউট্রনকে একত্রে বেধে রাখে নিউক্লিয়াসে। আর নিউট্রন যখন প্রোটনে পরিনত হয় তখন তেজস্ক্রিয় শক্তি হিসাবে দূর্বল নিউক্লিয়ার বলের প্রকাশ ঘটে। অটম বোম হচ্ছে শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বলের প্রমান। আর তেজস্ক্রিয় শক্তি যা অটম বোম বিস্ফরনের পর মাটিতে বা ঐ স্থানে পাওয়া যায় তা দূর্বল নিউক্লিয়ার বল। কিন্তু কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সে মহাকর্ষের কোন স্থান নেই।
এখন বিষয় হলো কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স ও জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটি দুইটি এমন থিউরি যেটি মহাবিশ্বের সব জায়গায় কাজ করে। সে ক্ষেত্রে তারা একি হবার কথা, কিন্তু তাদের একত্রিত করা অসম্ভব হয়ে দারায়। আর আইনিস্টাইনের মৃতুর পর সেটি অন্ধকারে চলে যায়।
কার্ল সোয়ার্ডসিল্ড জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটি থেকে একটি নতুন জিনিস আবিস্কার করেন। যদি কোন বস্তুর ভর অনেক বেশি হয় এবং আয়তন অনেক ক্ষুদ্র হয় তবে জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটি অনুসারে ঐ স্থানে মহাকর্ষ বল এত বেশি হবে যার কারনে আলোও বের হয়ে আসতে পারবে না সেখান থেকে। পরবর্তীতে যার নাম দেওয়া হয় ব্লেক হোল।
750px-accretion_disk.jpg
এখন বিষয় হলো ব্ল্যাক হোলের জন্য কোন থিউরি ব্যবহার করতে হবে। কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স যে হেতু এটি আকারে ছোট, না জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটি কারন এর ভর অনেক বেশি। দুইটি একসাথে ব্যবহার করলে দারায়না কোন অর্থ। সমধান হয়ত আছে স্ট্রিং থিউরিতে।
(চলবে)

মহাবিশ্ব ও স্ট্রিং থিউরি – ১ম পর্ব

Brian Greene এর বই The Elegant Universe এর একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি।
জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটির জনক বিজ্ঞানী আইনিস্টাইন তার জীবনের শেষ তিন দশক কাটিয়েছিলেন এমন একটি সমীকরণরে দাড়া করাতে যা দিয়ে মহাবিশ্বের যেকোন কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সেটা যতই ক্ষুদ্র বা বড় হোক না কেন। গত দুইশত বছর ধরে আমরা যেসব থিউরি, সমীকরণ বা তথ্য পেয়েছি তা থেকে উপলব্ধি হয়, আমাদের এই আবিষ্কার শুধু মাত্র একটি নির্দির্ট দিকে আমাদের নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আর তা হলো Unification. আইনস্টাইন থেকে শুরু করে অনেকেই চেষ্টা করেছেন এমন একটি সমীকরণ দাড়া করাতে যার পর আমাদের আর কোন কিছু ব্যাখার ত্রুটি থাকবে না। আমরা মহাবিশ্বের সৃষ্টি থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সব কিছু ব্যাখা দিতে পারবো। আর গত তিন দশক ধরে মনে হচ্ছে আমাদের এই সমস্যার সমাধান শুধু দিতে পারে স্ট্রিং থিউরি।
theelegantuniverse.jpg
ঘটনার শুরু ৩০০ বছর পূর্বে নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার গল্প থকে। নিউটন আবিষ্কার করেন যে গাছ থেকে আপেল পড়া আর সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর চক্রাকারে ঘুরা মূলত একই কারণে হয়। যার নাম দেন তিনি মহাকর্ষ, Gravity. এই প্রথম কোন বিজ্ঞানী দুটি আলাদা তত্ত্বকে একত্রিত করে। একটি সাধারণ সমীকরণে দাড়া করান। এটি ছিল Unification এর প্রথম সুচনা।
কিন্তু নিউটনের এই থিউরির পর মহাবিশ্বরে যে রূপটা ধরা পরে সমীকরণের মাধ্যমে তা নিয়ে আইনিস্টাইনই একটু নাখুশ ছিলেন। কারণ নিউটনের তত্ত্ব মতে মহাকর্ষ আসীম পর্যন্ত বিস্তৃত এবং মহাকর্ষের বলের পরিবর্তনে অন্য অনেক দূরের বস্তুর উপর একই সময়ে অনুভূত হয়। প্রকৃতপক্ষে নিউটনের জানা ছিল না। মহাকর্ষ কিভাবে কাজ করে বা কার মাধ্যমে মহাবিশ্বে মহাকর্ষ বিস্তৃত হচ্ছে।
আইনস্টাইন ২০০ শতকে এসে প্রমাণ করেন। মহা বিশ্বের কোন বস্তুর গতি আলোর গতির উপরে হতে পারে না। আলোর গতি মহাবিশ্বের শেষ গতিসীমা। আর এই গতিসীমা নিউটনের সমীকরণ মানে না। তাই আইনিস্টাইন খুঁজতে থাকেন এমন কোন ব্যাখা যার দ্বারা প্রমাণ করা যাবে মহাবিশ্বরে প্রকৃত রূপ ও মিলবে মহাকর্ষের আসল পরিচয়।
brian_greene_world_science_festival.jpg
দশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আইনস্টাইন প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত তত্ত জেনারেল থিউরি অফ রিলিটিভিটি যা মহাবিশ্বের চেহারা পাল্টে দেয়। এই থিউরি প্রমাণ করে মহাকর্ষ বল কিভাবে কাজ করে এবং এর গতিসীমা আলের গতির বেশি নয়।
নিউটের মতে মহাকর্ষ বল প্রত্যেক বস্তুর উপর শূণ্য সময়ে কাজ করে। সূর্যের যে ভরের জন্য পৃথিবীর তার চারপাশে ঘুরে। সেই ভর হতে উৎপন্ন মহাকর্ষ বল উঠিয়ে নিলে পৃথিবী তাৎক্ষণিকতার কক্ষপথ হতে বিচ্ছুরিত হয়ে নিউটনের প্রথম সূত্রের মত আচরন করবে। পৃথিবী অসীমের পথে চালিত হবে। কিন্তু আইনস্টাইন প্রমাণ করেন মহাকর্ষ বলের গতি আলোর গতির সমান। আর সূর্য থেকে পৃথিবীর আলো দেখতে সময় লাগে ৮ মিনিটের উপরে। তাহলে সূর্য যদি হঠাৎ ধ্বংস হয়ে যায় তবে তা আমরা জানতে পারব ৮ মিনিট পরে। তাহলে কথা হল মহাকর্ষ বল কীভাবে কাজ করে। আইনিস্টাইনের থিউরি সেই ব্যাখ্যা দেয় খুব সহজেই। তিনি চিন্তা করেন মহাবিশ্বের তিনটি সাধারণ মাত্র(থ্রি ডাইমেণশন) এবং সময় সহ ৪টি মাত্রার একটি জগৎ। আমরা যদি চিন্তা করি তিনটি সাধারণ মাত্রা ও সময় মিলে একটি ২ মাত্রার জগৎ তাহলে জিনিসটা আরো সহজ হয়
আমারা মনে করি মহাবিশ্বের সময়-স্থান একটি বিছানার চাদর, এখন এর কোন স্থানে আমরা যদি একটি ভারি বল রাখি তবে দেখা যাবে ঐ স্থানে চাদরটি ডেবে গিয়েছে এবং আশেপাশে বৃত্তকার একটি কার্ভের সৃষ্টি হয়েছে। এখন আমরা যদি ছোট একটি বল এই কার্ভেচারে ছেড়ে দিই তখন তা ঐ কার্ভেচার বারবার ঘুরতে থাকবে ( যদিও ছোট বলটি ঘুরতে ঘুরতে বড় বলটির কাছে চলে আসবে এই ক্ষেত্রে কেন আসবে না তা পরে ব্যাখ্যা করব। ) তাহলে ভরের কারণে মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থানে এভাবে ডেবে যাচ্ছে। আর এই চারপাশে ঘুরছে বাকি হালকা বস্তু গুলো।জেনারেল থিউরি অফ রিলিভিটির জনক বিজ্ঞানী আইনিস্টাইন তার জীবনের শেষ তিন দশক কাটিয়েছিলেন এমন একটি সমীকরণরে দাড়া করাত যা দিয়ে মহাবিশ্বের যেকোন কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
General Theory of Relativity
সেটা যতই ক্ষুদ্র বা বড় হোক না কেন। গত দুইশত বছর ধরে আমরা যেসব থিউরি, সমীকরণ বা তথ্য পেয়েছি তা থেকে উপলব্ধি হয়, আমাদের এই আবিষ্কার শুধু মাত্র একটি নির্দির্ট দিকে আমাদের নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আর তা হলো Unification. আইনস্টাইন থেকে শুরু করে অনেকেই চেষ্টা করেছেন এমন একটি সমীকরণ দাড়া করাতে যার পর আমাদের আর কোন কিছু ব্যাখার ত্রুটি থাকবে না। আমরা মহাবিশ্বের সৃষ্টি থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সব কিছু ব্যাখা দিতে পারবো। আর গত তিন দশক ধরে মনে হচ্ছে আমাদের এই সমস্যার সমাধান শুধু দিতে পারে স্ট্রিং থিউরি।
(চলবে)